শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩
কাগজের নৌকা..মন গহীণে ছুটে চলা সাম্পান এক
আমাদের কল্পনা অন্তহীন। আমাদের প্রতিদিনকার ধরাবাঁধা জীবন তার নিয়মিত গণ্ডির বাইরে এসে তৃপ্তি-অতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার পাশাপাশি পূর্ণতা-অপূর্ণতার হিসেব নিকেশে অনবরত খোঁজাখুজি করতে চায় কল্পলোকের আস্তাবলে। এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায়, পারিপার্শ্বিকতার যাঁতাকলে কখনো কখনো আমাদের স্পন্দন হয় অবলার ন্যায় পিষ্ট, আত্ম-সংকুচিত, সীমাবদ্ধ আবার কখনোবা সমস্ত বিধি-নিষেধ অগ্রাহ্য করে ভর দেয় ইকারুসের ডানায়। যুক্তি-প্রথার নিয়ম-নীতিকে তোয়াক্কা না করে, বিস্তারের সীমাবদ্ধতাকে গোঁজামিল দিয়ে ছুটে চলে নিরন্তর,স্বল্পতাকে পুঁজি করে আস্তানা গাড়তে চায় নূতন কোন বাহানায়।
কাগজের নৌকৌয় ভর দিয়ে উত্তাল কোন বিশাল জলরাশির মোকাবেলা করা যাবে কি যাবেনা সে প্রশ্নটিকে আপাতত আমাদের মনের একটি ওয়াটারপ্রুফ কম্পার্টমেন্টে তালাবদ্ধ করে রাখি, সুপ্রিয় লেখক আশীফ এন্তাজ রবির আমন্ত্রণে কাগজের নৌকায় সওয়ার হয়ে ভেসে পড়ার পরে না হয় চিন্তা করা যাবে উত্তাল সমুদ্রে, বিশাল বিশাল দানবাকৃতির ঝড় মোকাবেলা করে সেই নৌকা টিকে থাকতে পারবে, নাকি পারবেনা? নাকি চিরটাকাল হালবিহীন হয়ে অজানা পথে ভেসে বেড়াবে?
জলে নৌকা থাকুক সমস্যা নেই,নৌকায় জল থাকলে সমস্যা। তুমি সংসারে থাকো ক্ষতি নেই, কিন্তু তোমার মধ্যে যেন সংসার না থাকে। আমরা কেউ শ্রীরামকৃষ্ণ নই। কাজেই সুনাগরিকের মতো আমাদের সংসারের ভেতর যেমন বাস করতে হয়, তেমনি আমাদের ভেতরেও জোরালোভাবে সংসার আছে, সংসার থাকে। মাস গেলে বাড়িভাড়া, আইপিএসের ব্যাটারি নষ্ট হলে, সেটি বদলে ফেলা, বড় মেয়েটা অন্কের চেয়ে ইংরেজিতে কেন কম নম্বর পেল, সেটি নিয়ে ভাবা, ছোট মেয়েটার জ্বর হলে তার মুখে থার্মোমিটার পুরে দেয়া-কত কাজ। সংসারে না থেকে উপায় আছে।
সংসারে আবদ্ধ থাকা বা না থাকার ইচ্ছেটিকে সুপ্ত রেখে গল্পের দুই মূল কুশীলবের একজন রাজীব হাসান এর উপর প্রথমেই দৃষ্টি ফেরানো যাক। বয়স ৩৫, পেশায় সাংবাদিক, লেখকের ভাষায় “সাংবাদিক বলতে যে সাহসী, নিষ্ঠাবান, দুর্ধর্ষ, যুযুধান, জঙি এবং সত্যপ্রকাশে উদগ্রীব একদল মানুষের ছবি ভেসে ওঠে, আমি ঠিক তাদের দলে নই” বাঁইশটি অধ্যায়ে বিভক্ত অনেকটা ডায়ালগের ছলে কাহিনীর ব্রম্মাণ্ডে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি লেখক আমাদের শোনান তার শ্যাওলা পড়া, ছকবাঁধা জীবনের গল্প, যে জীবনে ভরপুর হয়ে আছে কপট মান-অভিমান, হাসি, আনন্দ আর কিছু জমে থাকা,ভারী হওয়া দীর্ঘশ্বাস। সে জীবনে সওয়ারী হয়ে ক্রমে ক্রমে আসে রাজীব হাসানের স্ত্রী মিতু, সিমু ইসলাম, মারুফ, মুসা, জিমিসহ আরো গোটাকয়েক।
আমরা তিন হতভাগা পুরুষ, তিন মতিচ্ছন্ন স্বামী, তিন বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস, তিনটি গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকি। ক্রমেই তিনটি গ্লাস ঘেমে ওঠে। সিমু চিয়ার্স শব্দটার বাংলা করেছে, মালে বাড়ি। আমরা গ্লাস ঠোকাঠুকি করে একযোগে বলি, মালে বাড়ি। এক চুমুক খেয়েই মারুফের চেহারা থেকে বিষণ্নতার পর্দা সরে যায়। দারুন একটা হাসি দিয়ে বলে, লাইফ ইজ বিউটিফুল। জীবন সুন্দর কিনা সেটিকে মুহুর্তের মধ্যে প্রমাণ করতে চারপাশ আলোকিত করে অবশ্যম্ভাবীভাবে হাজির হয় মূল গল্পের আরেক কুশীলব নীল অপরাজিতা।
আমি নীল, দ্য নীল অপরাজিতা। আমি ফরসা, মারকুটে সুন্দরী। রোজ সকালে আমি আয়নার সামনে দাঁড়াই। অনেকটা সময় নিয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকি। তাকিয়েই থাকি, আমার আশ মেটেনা। নিজেকে খুব করে জরিপ করি। কোথাও কি কোন খুঁত আছে? নাকটা কি একটু বোঁচা? ঝলমলে চুলগুলো আজ কি একটু কম ঝিকিমিকি করছে? আয়নার দিকে তাকিয়ে আমি মুখ ভেংচাই,ট্যারা চোখে তাকাই, ভ্রু কুঁচকাই, দাঁতমুখ খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। এটা হচ্ছে আয়নাকে কষ্ট দেওয়া। তারপর চোখমুখ স্বাভাবিক করে আবার আয়নার দিকে তাকিয়ে একটা ভুবনজয়ী হাসি ছুড়ে মারি। এটা হচ্ছে আয়নাকে সুখ দেওয়া। এসব আমার সকলাবেলার ‘আয়না আয়না’ খেলা। খেলা শেষে নিজেকে গুছিয়ে, ছোটখাটো খুঁতগুলোকে মেরামত করে, ক্লিপের নিচে ঝলমলে চুলগুলোকে ধামাচাপা দিয়ে, চোখের নিচের কালি সযত্নে চাপা দিয়ে রাস্তায় বের হই।
নীল অপরাজিতার মনের অলিগলিগুলো খুঁজে ফিরে এর উৎসমূলগুলো বের করা হতে পারে নেহায়েত এক ঝক্কির কাজ। শুরু থেকেই প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসীরূপে হাজির হয় গল্পের নীল অপরাজিতা। অবশ্য শেষ দিকে এই আত্মবিশ্বাসে এসে চিড় ধরে, বলা ভালো, রাজিব হাসানের একাগ্রতায় আর হার না মানার মানসিকতা তাকে শেষপর্যন্ত স্থিরপথে আসার রাস্তা দেখাতে বাধ্য করে, মুহূর্তে মুহূর্তে ভেঙ্গেচুড়ে আবারো শীতলীকরনের প্রক্রিয়ায় জমাটবাঁধার চেষ্টা করে নীল। বলে নেয়া ভালো অপরাজিতা আর রাজিব হাসানের মেলবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়াটিকে লেখক একসূত্রে দারুনভাবে গেঁথেছেন ‘ফেসবুক’ নামক বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ টুলসটিকে ব্যবহার করে।
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হচ্ছে, ছেলদের ঘোল খাওয়া। রাজিবকে যখন বললাম, আমি বেশিদিন নেই, তখন রাজিব বেশ ভচকে গেল। এরপরতো সুনামির মতো মেসেজ পাঠানো শুরু করছে। চলে যাচ্ছেন মানে? কোথায় যাচ্ছেন? বিদেশে? নাকি অন্য কোনো সমস্যা? আচ্ছা আপনার কোনো অসুখ বিসুখ নেইতো? চলে যাওয়া মানে কি? কোনো ভয়ংকর কিছু? হি হি হি। ছেলেটা ভালোই ঘোল খাচ্ছে। আহা রাজিব, খাও, খাও, আরও ঘোল খাও। আরেক গ্লাস ঘোল বানিয়ে দেব?
বইয়ের প্রথমাংশের বার্তা আদান প্রদানের সময়টুকুতে লেখক রাজিব কিংবা অপরাজিতা দুজনকেই তাদের নিজ নিজ সাম্রাজ্যের বিস্তার অটুট রেখে প্রতিপক্ষকে ঘোল খাওয়ানোতে ব্যস্ত রেখেছেন। এ ঘোল খাওয়ানোর প্রতিযোগীতায় অপরাজিতা তার স্বভাবগুণে জীবনের গল্প খুঁজে বেড়ানো রাজিবের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে থাকে। তবে শেষাংশে সেই উত্তেজনা হ্রাস হয়ে দুজনেই পরস্পরের কাছাকাছি আসার সুযোগে ব্যস্ত হয়। লেখক আশ্চর্য দক্ষতায় আমাদের চারপাশের ঘটনাপুঞ্জ থেকে বাস্তবতার নিরিখে আমাদের নিয়ে তার আবেগের নৌকায় ভেসেছেন, কখনো সে আবেগ বাঁধ ভেঙ্গেছে,কখনো ভাঙ্গেনি, শুধুমাত্র গতিপথ বদলিয়েছে, স্তব্ধ করেছে কয়েকটি মুহুর্তের জন্য, ফিরে ফিরে নজর বুলাতে বাধ্য করেছে আমাদের সঙ্গী সারথিদের উপর:
আমি কেঁপে উঠলাম। নিজেকে শক্ত রাখব ভেবেছিলাম। শক্ত থাকা এতো সহজ হলো না। তবু প্রাণপণ নিজের সঙ্গে লড়াই করতে করতে আমি পাঁচটি শব্দ কোনোক্রমে উচ্চারণ করলাম। আমি ভীষন ভাঙ্গা গলায় বললাম, মিতু। আমি আলাদা থাকতে চাই। আমার মাথায় হাত বুলাচ্ছিল মিতু। সেই হাত আচমকা থেমে গেল। মিতু কোনো কথাই বলল না। আমিই ভেঙ্গে পড়লাম। আমি হু-হু করে কাঁদতে লাগলাম। মিতুর বুকে মাথা রেখে। মিতু পাথর হয়ে সেই কান্না শুনল। একটা কথাও বলল না, একটি শব্দও না।
স্বাভাবিকভাবে পাঠকমাত্রই বিমোহিত হয়ে নিজকে মেলাবে ঘটনার ঘণঘটায়, একজন রাজিব কিংবা একজন অপরাজিতার অবয়বে, নানান অনুষঙ্গে, নানারকমের ঘটনাপ্রবাহে কেউ কেউ অপেক্ষায় থাকবে কারো কারো ফেরার প্রতীক্ষায়। গল্পের অবয়বে অপরাজিতার স্বামী একজন শুভ হয়তো অনেক ধীর, স্থির, ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করে শেষ সময় পর্যন্ত অপরাজিতার জাহাজ নোঙরের অপেক্ষায়, ঠিক তেমনিভাবে একজন মিতুও হয়তো অপেক্ষা করে থাকে শেষ সময় পর্যন্ত একজন রাজিব হাসানের মুহূর্তের ভুল ভেঙ্গে ফেরার প্রতীক্ষায়। আশার কথা হলো এই, ভিন্ন পথে চলে যাওয়া দুটি নৌকো আবারো ভেসে চলে তার পুরোনো গন্তব্যের অভিমুখে:
এক নজরেঃ
বইঃ কাগজের নৌকা
লেখকঃ আশীফ এন্তাজ রবি
ধরনঃ গল্পগ্রন্থ
প্রচ্ছদঃ সব্যসাচী হাজরা
প্রকাশকঃ প্রকাশক
প্রথম প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর, ২০১৩
মোট পৃষ্ঠাঃ ৯৪
মূল্যঃ ১৮০.০০ টাকা
আইএসবিএনঃ ৯৭৮-৯৮4-৩৩-৭৭৭৩-৯
পুনশ্চ: লেখক গল্পের শুরুতেই কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে বলে রেখেছেন “এই গল্পের মূল চরিত্র একজন লেখক। আমি নিজেও টুকটাক লেখালেখি করি। কাজেই কেউ যদি ধরে নেন, এটা আমার গল্প,তাহলে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়া ছাড়া অন্য উপায় থাকবেনা” সুপ্রিয় পাঠক, আসুননা চলে আসুন, কাগজের নৌকোয় ভেসে গিয়ে জেনে, শুনে, বুঝে, সজ্ঞাণে লেখকের নিজের গল্প মনে করে লেখককে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও মাথায় হাত দিয়ে বসিয়ে রাখি।
আশরাফুল কবীর
১৯শে আশ্বিন, ১৪২০
মতিঝিল, ঢাকা।
শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৩
কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধান
মাত্রইতো
কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধান!!
হায়!
তোমরা সকলেই
ব্যস্ত হয়েছো প্রাত্যাহিক নানান রঙ্গে
এখনো আমরা
নীচেই আছি, অন্ধকার প্রকোষ্ঠে
নিমজ্জিত
হয়ে গুনে চলেছি প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর ধারাপাত!
যবনিকা
পতনের গান,
ক্ষীণ থেকে
ক্ষীণতর হয়ে চলেছে
দিনরাত
সব একাকার করে বেঁচে থাকার আশায়
খাঁচাবদ্ধ
বুভুক্ষু শতো সহস্র প্রাণ,
জেনো, জেনে
রেখো-
আমরাও আছি
তোমাদেরই কাছাকাছি
শুধু কয়েক
কিলোমিটারের ব্যবধান!!
আমরা কি
ছিলামনা তোমাদেরই আনন্দের উৎস?
পালা-বদলের
হাতিয়ার?
এখনো তিল
তিল করে লড়ে চলেছি ক্ষুধার্ত অবস্থায়
খুঁজে চলেছি
একটুখানি ফাঁকফোকর
আরেকটি
নূতন ভোর প্রতীক্ষায়
ধরে রেখেছি
এখনো মুমূর্ষু ধড়টিতে
একটুখানি
বেঁচে থাকার প্রাণ-
জেনো, জেনে
রেখো-
আমরাও আছি
তোমাদেরই কাছাকাছি
শুধু কয়েক
কিলোমিটারের ব্যবধান!!
এখনো পৌছুলোনা
কেনো শক্তিশালী অক্সিজেন পাইপ
আমাদের
বুঝি বাঁচার সাধ নেই?
কিভাবে
যেনো পার করে দিয়েছি শতবর্ষকাল!
কোনো কাল্পনিক
সময় প্রতীক্ষায়..
জানি,
এটা তা
ধিন ধিন সময়,
তবুও আকঁড়ে
ধরতে চাইছি
মানবতার
টাইটেলে বিপর্যস্ত হতে থাকা
আমাদের
বিপন্ন জান-
জেনো, জেনে
রেখো-
আমরাও আছি
তোমাদেরই কাছাকাছি
শুধু কয়েক
কিলোমিটারের ব্যবধান!!
[এখনো রানা
প্লাজার ধ্বংসস্তুপের নীচে আটকে থাকা মুক্তির প্রতীক্ষায় শতো শতো ভাইবোনদের প্রতি]
************
আশরাফুল
কবীর
১৩ই
বৈশাখ, ১৪২০
মতিঝিল,
ঢাকা।
সোমবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১২
“আমায় কেন বসিয়ে রাখ একা দ্বারের পাশে”
রাধা
আমারওতো অনেক কাজ থাকতে পারে
তাইনা?
অপেক্ষাতে অনেকটা সময় বসিয়ে রেখেছ
অস্থিরচিত্ত আমি
এ মুহূর্তে তোমার জলকেলিতে ব্যস্ত হবার কথা
বলো রাধা: এ
তোমার কেমন
রুটিনবিহিীন অসংলগ্ন প্রথা?
খোলা জানালায় এক বসন্তখচিত মুখ
অনেক দিন পর, প্রতীক্ষার অনেক রূদ্র সময় পর
ও বাড়ির জানালাটি হঠাৎ খুলে গেল আজ
সাথে সাঁই সাঁই করে ছুটে গেল সকল চঞ্চলতা
আবারো ঝাঁপটে ধরলো বৃহন্নলা সময়
তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে চললো
কোন এক হেমন্ত সন্ধার অন্ধকারে
অদ্ভুত, ঘোরলাগা কোন জোনাকের আকারে।
এখন আর অতোশতো মনে পড়েনা
কিছুটা অস্পষ্টতা যেনো
শুধু উঁকি দিয়ে যায় শিহরণ জাগানিয়া বাতাস
মনের কুঠুরীতে জমা হয়ে থাকা গুটিকয়েক ঝোপবন
আলোহীন, স্পর্শহীন
কিছু বৃষ্টির ছিটেফোঁটায় সময় যাপন
সম্মোহিতের ন্যায় আনমনেই বলে ওঠি
বসন্তখচিত মুখ: জানতে পারোনি, বুঝতে পারোনি
দুরন্ত সময়ে ছিলে কতোটা আপন।
আজ অবেলায়, এতোগুলো রজনী পর
চারপাশ জুড়ে শুনি হারানো বাঁশির সুর
প্রতীক্ষায় থাকা রাত্রি প্যাঁচার মতো খুঁজে
বেড়াই
একেবেঁকে ছুটে চলা পথের উৎসমুখ
বুঝতে পারি, একেলা পথ হেলেছে কোন দিকে
দ্বিধাহীন দূরে, ক্রমশ দূরে, সে হয়েছে ফিকে।
[“আমায় কেন বসিয়ে রাখ একা দ্বারের পাশে” এ চরনটি
“শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর” এর “গীতাঞ্জলি” কাব্যগ্রন্থের ১৬ নং গান থেকে সংগৃহীত]
***************
২৭শে আশ্বিন, ১৪১৯
মতিঝিল, ঢাকা।
রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১২
আঁধারী সাঝ
মধ্যচৈত্রের বনে মশগুল এক বিষন্ন ঋষি
কেবলি কলহ করে ঝরে পড়া বকুলের সাথে
কোন মৌতাত জাগাতে পারেনা সকল চিত্রগাঁথা
অর্ফিয়াসের সুরে..
শুধু
ক্ষণে ক্ষণে নিয়ে যায়
ফ্ল্যাশব্যাক করে দূরে?
আজ-
কড়িকাঠে বেজে চলে একটানা ঘুণপোকার আওয়াজ
সময়ের মানচিত্রে দেখা দেয় কেবল
এক অচেনা আঁধারী সাঝ।
*****************
১২ই কার্তিক, ১৪১৯
মতিঝিল, ঢাকা।
শুক্রবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১২
বিষন্ন বেলার বাঁশি
ক্রমে ক্রমেই সরে যাচ্ছে আশেপাশের তারা সকল
প্রচণ্ড গতিবেগে ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশজুড়ে
যেন হয়েছে আরেকটি বৃহৎ বিষ্ফোরন, সৃষ্টির আদিকালের মতো
তবুও জেগে ওঠেনা এখন নূতন কোন “কিউরিওসিটি”
অতীত বর্তমানের প্রান্তজুড়ে-কোন নূতন প্রানের
সন্ধানে
বিগব্যাং থেকে ব্ল্যাকহোলের মধ্যবর্তী যতো।
জ্বলেই চলেছে প্রমেথিউসের আগুন
প্রতীক্ষার অবসানে দেখছেনা আর শিশিরকণার স্ফূরণ
ঝাউবনের হাসি
যেন:
টেনে চলা হন্তারক সময় বাজিয়ে চলেছে কেবল
এক বিষন্ন বেলার বাঁশি।
শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২
শুকনো ফ্ল্যান্ডার্সের ঝাড়..
বেলা পড়ার আগেই সূর্যডোবা রঙ
ভেসে চলে কিছু ব্যর্থ সময়ের উপাখ্যান
আলো আঁধারে স্টিকি হয়ে চলে কোন শীর্ণ নদী
ঝরে পড়ার বাসনায় একমনে এগিয়ে চলে
ভাবে, কি উপায় হবে বলো স্কাইলার্ক
কোন সাগরবক্ষ আমন্ত্রণ জানায় যদি।
আমন্ত্রণ! এক রোদ্দুরহীন আকাশ আজ
ভোর হয়ে আসার দীর্ঘ প্রতীক্ষায়
শুকনো হয়েছিল যে ফ্ল্যান্ডার্সের ঝাড়
জোনাকির ঝাঁকে ঝাঁকে আজ সে নূতন স্বপ্ন দেখে
প্রজাপতিরা ফিরেছে সেই কোন বিকেলে
হয়তোবা রঙিন ডানাগুলো খুলে রেখে।
তাই বিবর্ণ হয়ে আসে ঝুলে থাকা চাঁদ
কিংবা বিবর্ণ হয়ে ভাসে ঝুলে থাকা কার্নিশ
সজীব সপ্রাণে তাড়িত করে হাওয়াশূণ্য স্তব্দ আকাশ
গোধূলীবেলার লালিমা..
জানার ইচ্ছেটা জেগে ওঠে শেষবেলায়
কোথায় শুরু তুমি কোথায় শেষ
বলো নি:সীম নীলিমা?
ভেসে চলে কিছু ব্যর্থ সময়ের উপাখ্যান
আলো আঁধারে স্টিকি হয়ে চলে কোন শীর্ণ নদী
ঝরে পড়ার বাসনায় একমনে এগিয়ে চলে
ভাবে, কি উপায় হবে বলো স্কাইলার্ক
কোন সাগরবক্ষ আমন্ত্রণ জানায় যদি।
আমন্ত্রণ! এক রোদ্দুরহীন আকাশ আজ
ভোর হয়ে আসার দীর্ঘ প্রতীক্ষায়
শুকনো হয়েছিল যে ফ্ল্যান্ডার্সের ঝাড়
জোনাকির ঝাঁকে ঝাঁকে আজ সে নূতন স্বপ্ন দেখে
প্রজাপতিরা ফিরেছে সেই কোন বিকেলে
হয়তোবা রঙিন ডানাগুলো খুলে রেখে।
তাই বিবর্ণ হয়ে আসে ঝুলে থাকা চাঁদ
কিংবা বিবর্ণ হয়ে ভাসে ঝুলে থাকা কার্নিশ
সজীব সপ্রাণে তাড়িত করে হাওয়াশূণ্য স্তব্দ আকাশ
গোধূলীবেলার লালিমা..
জানার ইচ্ছেটা জেগে ওঠে শেষবেলায়
কোথায় শুরু তুমি কোথায় শেষ
বলো নি:সীম নীলিমা?
অনেক দূরে
সারাবেলা
কথা হয়,সারাবেলা
পথের পাশে কখনোবা চুপটি করে একা একা
নিশুতি রাতে সঙ্গী হয় জোনাকদল
ঝরা পাতা জমে জমে পাহাড়তল
দূর দিগন্তে মিলিয়ে যায় পথের রেখা।
আবারো না হয় আসবো ফিরে বাশিঁর সুরে
কাছাকাছি থেকেও থেকো অনেক দূরে।
পথের পাশে কখনোবা চুপটি করে একা একা
নিশুতি রাতে সঙ্গী হয় জোনাকদল
ঝরা পাতা জমে জমে পাহাড়তল
দূর দিগন্তে মিলিয়ে যায় পথের রেখা।
আবারো না হয় আসবো ফিরে বাশিঁর সুরে
কাছাকাছি থেকেও থেকো অনেক দূরে।
দীর্ঘশ্বাস
শুরু ছিল তাই শেষ ও হল
তাই এমন শক্ত হলাম বুঝি!
ছাড়ছি ধীরে ধীরে চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস
ক্ষনিকেই বের হয়ে গেল
আহ! বড্ডো সেলুকাস
জেনে রেখো,হারিয়ে যাওয়া প্রিয়
আমাতেই ছিল তোমার দীর্ঘ বসবাস।
তাই এমন শক্ত হলাম বুঝি!
ছাড়ছি ধীরে ধীরে চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস
ক্ষনিকেই বের হয়ে গেল
আহ! বড্ডো সেলুকাস
জেনে রেখো,হারিয়ে যাওয়া প্রিয়
আমাতেই ছিল তোমার দীর্ঘ বসবাস।
শুক্রবার, ১৭ আগস্ট, ২০১২
আনন্দ বেদনায় অম্লান: ঈদ কথকথা
ছোটবেলা
ক্লাস ফাইভ ছেড়ে সবে মাত্র সিক্সে ভর্তি হব ঠিক এ সময়টিতে বাবা বদলি হলেন শহর থেকে, বলা যায় একদম অজপাড়াগাঁয়ে। আমার বাবার সরকারি চাকুরির সুবাদে আমাদের কদিন পরপরই এ ধরনের বদলি আতঙ্কে থাকতে হতো। আজ এ স্থানে তো কাল বাদে পরশু একদম নূতন কোন স্থানে।
একেতো নূতন স্থান তার উপর নূতন নূতন মানুষদের সাথে পরিচয় আমাদের বিরক্তি উৎপাদন করতো কিন্তু কিচ্ছু করার উপায় ছিলনা, পরিচিত উপরের কোন আত্বীয় স্বজন না থাকাতে ছিলনা বদলি ক্যানসেল করার কোন ধরনের কোন উপায়।
যদিওবা কোন উপায় ছিল কিন্তু তা ছিল আমার বাবার সাধ্যের অনেক বাইরে, অগত্যা যাওয়া ছাড়া কোন রাস্তা খোলা থাকতনা।
শহরের উপকন্ঠ ছেড়ে চলে আসতে হলো গাছগাছালিতে ঘেরা হাওরবেস্টিত অঞ্চলে, সবচেয়ে ভাল লেগেছিল যে জিনিসটি তা হল নূতন বাসার অদূরেই ছিল বয়ে যাওয়া একটি নদী। অফিস কোয়ার্টার হওয়ায় বিশাল একটি বাসা প্রাপ্তি ছিল আমাদের অন্য ধরনের আরেকটি আনন্দের উপলক্ষ। আরো একটি জিনিস দ্রূত আবিষ্কার করে ফেললাম তা হল কিছুক্ষণ পরপর নদী দিয়ে চলে যাওয়া ট্রলারের দ্রিম দ্রিম শব্দ বাসা থেকে বসেই শোনা যায়।
নদীর কোলে
ছোটবেলায় মাঝে মাঝে লঞ্চে চড়ে ঢাকা আসার সময় নদী দর্শন হতো। বইয়ের নদী আর বাস্তবের নদী মিলতনা কোনভাবেই, বাস্তবের নদীটিকে মনে হতো বিশাল কোন কিছু যার বুক চিড়ে অনবরত চলছে বিশাল বিশাল স্টিমার। আমার নিকট সবগুলো লঞ্চকেই এক একটি স্টিমার মনে হতো। ভুলটা বাবা ভাঙ্গিয়ে দিতেন সময় সুযোগ মতোন।
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম আমরা তারপর মুন্সীগঞ্জ থেকে লঞ্চে করে সোজা এসে পৌছাতাম ঢাকায়, এসে থাকতাম খালাম্মার বাসায় একরাত এবং ঠিক তার পরদিনই ঢাকা থেকে সিলেট আমার দাদাবাড়ী, অবশ্য আমাদের দেশের বাড়ি হচ্ছে হবিগঞ্জ কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করলে সোজা বলতাম সিলেট।
ঈদ উপলক্ষে সিলেট যাবার কালে ভৈরব সেতুতে ফেরি পারাপার ছিল আরেকটি আনন্দের উপলক্ষ। লোহা লক্করের তৈরী বিশাল ব্রিজেটির নীচ দিয়ে ফেরি যখন মেঘনা নদী পার হতো তখন বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে কেবল অবাকই হতাম আর কিছুক্ষণ পর পর লাল রঙের ঠান্ডা মিরিন্ডার বোতলে চুমুক দিতাম।
যদি কোনভাবে দেখা যেত ব্রিজের উপর দিয়ে ট্রেন ছুটছে তাহলে তো কোন কথাই নেই, সবাই একযোগে চিৎকার করে ওঠতাম “ট্রেন, ট্রেন, ট্রেন - ঐ দেখ ট্রেন যায়”
আমাদের বাসায় থাকা একই ক্লাসে পড়ুয়া আমার খালাত ভাই আমার সাথে ট্রেন দেখার প্রতিযোগীতা শুরু করতো, বেশীর ভাগ সময়ই ট্রেন যে পাশটি দিয়ে চলে যেতো সে খুঁজতো ঠিক তার উল্টো দিক দিয়ে। বাবা ওর দিকে তাকাত আর হেসে হেসে বলতো “আরে গাধা! ঐ দিকে না, উল্টা দিকে”
খুব ভাল লাগত নদীর মাঝখানে নোঙ্গর করে থাকা বিশাল বিশাল লঞ্চগুলোকে দেখতে। অবশ্য বাবার ভাষায় “ঐগুলো লঞ্চ নয়, ঐগুলো হল স্টিমার”
আমাদের অফিস কোয়ার্টারের ডানদিকে ছিল গ্রামটির একমাত্র স্কুল, আরেকটু ডানপাশ দিয়ে বাসার পেছন দিয়ে ছিল গ্রামে যাবার পায়ে হাঁটা পথ। খুব ঘন গাছপালায় পরিপূর্ণ হওয়ায় বনবিড়ালদের দেখা পাওয়া ছিল নিত্তনৈমত্তিক ব্যাপার স্যাপার। আমার আম্মা অবশ্য মাঝে মাঝেই খুব বিরক্ত হয়ে বলে ওঠতেন “কোথায় এসে পড়লামরে বাবা!”
অফিসের সম্মুখে বিশাল দুয়েকটি রেইন-ট্রি গাছ ছিল, আর ছিল তার আশে পাশে গোটা কয়েক চা-স্টলের দোকান আর পরিষ্কার করে রাখা কিছু জায়গা যেখানে সপ্তাহের প্রতি শনিবার ও বুধবার হাট জমে ওঠত।
নূতন স্থানে এসে আবারো নদী দর্শন হলো আমাদের সকলের। তবে এবারের নদীটি আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাড়াল। ভর বর্ষায় এর রূপ হয় একরকম আর শুকনো মৌসুমে হয় আরেক রকম।
আমি অবশ্য নদীটিকে নদী বলে মেনে নিতে পারতামনা, বারবার শুধু মনে হতো “আরে ধূর! এইটা কোন নদী হইলো, নদী এত্তো ছোট হয় নাকি” মনে মনে ভাবতাম এখানে বোধ হয় বেশী দিন থাকা হবেনা।
অবশ্য বাস্তব ঘটনা ঠিক তার উল্টো হয়েছিল। খুব হলফ করে বলা যায় এই ছোট ধলাই নদীর তীরেই আমাদের পরিবারকে কাটাতে হয় প্রায় বিশটি বছর। আমরা ছেড়ে চলে আসতে চাইলেও নদীটি আমাদেরকে ছাড়েনি।
বাবা জেলার ভেতরেই আরো বেশ কয়েকটি জায়গায় বদলি হয়েছিলেন তবে আমরা আমাদের বাসা আর সেখান থেকে বদলিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়নি। ট্রলারের অদ্ভুত ‘দ্রিম’ ‘দ্রিম’ ছন্দে আমরা সবাই মায়াচ্ছন্ন ছিলাম দীর্ঘদিন।
বেশ কিছুদিন পরে জানতে পারলাম আমাদের বাসার পাশের নদীটির নাম ‘ধলাই’ নদী, ধলাই বললেই আমার জানাশোনা ‘ধলেশ্বরী’ নদীর নাম ভেসে ওঠতো। কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের এলাকায় অনেক পরিচিত বন্ধু গড়ে ওঠলো।
আমার সাথে পরিচিত হলো আশে পাশের বেশ কিছু গ্রামের একই ক্লাসের কয়েকজন ছেলের। এদের মধ্য অন্যতম দুয়েকজনের বাড়ি ছিল নদীর ওপাশটায়।
নদীর কিনারে দাড়ালে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে নদীর ওপাশটায় দেখা যেত মানিকদের বাড়িটা। তখনো যাওয়া হয়নি ওদের বাড়িতে, মানিক আমাকে নদীর তীরে দাড় করিয়ে চেনাতে চেষ্টা করতো ওদের বাড়ি। বলতো
“ঐ দেখো টিনের ঘরগুলো উঁচু উঁচু, আর ঐ লম্বা লম্বা নারিকেল গাছগুলো, ঐটাই আমাদের বাড়ি”
আমি অবশ্য বাড়ি না চিনতে পেরে অনেকগুলো লম্বা লম্বা নারিকেল গাছ দেখতাম এদিক সেদিক, বোঝার চেষ্টা করতাম ওদের বাড়ির অবস্থান আর ওর কথায় মাথা ঝাঁকাতাম এই বলে, “হুমম, চিনতে পারছি”
বেশ কয়েকবছর নূতন স্থানটিতে ঈদ করা হয়নি তাই বাবা ঠিক করলেন সেবার সেখানেই ঈদ করবেন, সিলেট যাওয়া হবেনা। বাবা বললেন
“এবার আমরা এখানেই ঈদ করবো, সিলেট যাওয়াটা অনেক ঝামেলার, কোরবানীর ঈদে সবাই একসাথে বাড়ি যাব”
যাত্রাপালা
অপরিচিত হওয়ায় নূতন জায়গায় আমাদের ঈদ তেমন একটা আনন্দদায়ক হলোনা। বিকেলে মানিক আসলো এবং আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য, বললো:
“আন্টি রাসেল রাতে আমাদের বাড়িতে থাকবে আমার সাথে, আজকে আমাদের বাড়িতে রাতে গান আছে”
ভরা বর্ষাকাল বলে ওদের বাড়িতে ট্রলারে করে যেতে হবে। আমার আম্মা একবাক্যে না করে দিলেন কিন্তু আমার জোর দেখে শেষ পর্যন্ত যেতে দিলেন বললেন
“ঠিক আছে যাও, তবে সাথে করে করিমকে নিয়ে যাও” বলে রাখা ভাল করিম হলো আমার খালাতো ভাই।
গান বলতে গ্রামে গঞ্জে অনুষ্ঠিত হওয়া যাত্রা পালাকে বোঝায় সেটা আমি রাতের বেলায় টের পেলাম, তবে যাত্রাপালা ঠিক সেটাকেই বোঝায় তা পরিষ্কার হয় আরো বেশ কয়েক বছর পরে। আমার এর পূর্বে যাত্রাপালা দেখার কোন অভিজ্ঞতা ছিলনা। মানিক আমাকে তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খাওয়াল এবং তারপরেই বললো “রাসেল, চলো, চলো, তাড়াতাড়ি চলো, জায়গা নিতে হইবো”।
কোথায় যাবো আর কোথায় জায়গা নেবো আমি ঠিক বুঝতে পারছিলামনা তবে মানিকের ভাব দেখে বুঝতে পারলাম কিছু একটা করতে হবে তাড়াতাড়ি, তাই দ্রূত করতে লাগলাম। খাওয়ার পর্ব শেষ করে কিছুদূরে আরেকটি বাড়িতে গিয়ে উঠলাম, দেখলাম বেশ বড় ধরনের একটি স্টেজ বানানো হয়েছে।
স্টেজের চার কোনায় চারটি বিশাল হ্যাজাক লাইট জ্বলছে, লাইটের আলোতে বেশ অনেকটা দূর পর্যন্ত আলোকিত হয়ে আছে। স্টেজ ঘিরে আছে অনেক লোকজন, মেয়েদের জন্য আলাদা একটি অংশ রাখা হয়েছে, সেখানে অনেক দূরের গ্রাম থেকেও মহিলারা ছেলেমেয়েসহ এসেছে গান দেখার জন্য।
মানিক খুব দ্রূত কিছু ধানের খড় নিয়ে আসলো এবং মঞ্চের একদম নিকটে গিয়ে খড় দিয়ে দুটি আসন তৈরী করে ফেললো, ওর চোখে মুখে এমন একটি ভাব খেলা করছিলো যেনো কোন কিছুই সে মিস করতে চায়না আর গানের সবকিছুই সে উপভোগ করতে চায়।
আমরা যে পাশটিতে বসেছিলাম ঠিক তার উল্টো দিকে তিনজন বয়স্ক লোক তিনটি বড় ধরনের পিতলের অর্গান নিয়ে বসেছিল। হঠাৎ খেয়াল করলাম তিনজনই অর্গানগুলো বাজাতে শুরু করলো, বিকট বাজনা আসলো, সাথে সাথে মঞ্চের ভেতর কয়েকজন ছেলে এসে প্রবেশ করলো।
কারো বয়স আন্দাজ করা যাচ্ছিলনা কারন প্রত্যেকের মুখ অদ্ভুত রকমের সাদা রঙ দিয়ে আচ্ছন্ন করা ছিল। বুঝতে পারছিলামনা এরকম বিরক্তিকরভাবে কেন মুখে রঙ মেখে সঙ সেজে এসেছে, মানিকের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে হারিয়ে গেছে গানের ভেতর।
মঞ্চের অপর পাশে আরেকজন লোককে দেখলাম একটি খাতা মতোন কি যেনো নিয়ে বসে আছে, লোকটিকে দেখামাত্রই চিনতে পারলাম। এতো সেই লোক যে কিনা আমাদের বাসার সামনে যে সপ্তাহের হাটে বসে দোকান নিয়ে, খুব অদ্ভুত লাগলো তখন এই ভেবে যে ওই লোক এখানে কি করছে।
মঞ্চ থেকে আসা গানের চিৎকারে সম্বিত ফিরে আসলো, শুনলাম লোকগুলো গাইছে
“এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা, সুরমা নদীর তটে”
গান শেষ না হতেই বাঁশি হারমোনিয়ামের একত্রিত শব্দে পালা শুরু হলো যা মানিকের ভাষায় ছিল গান। পালার নাম ছিল “কাজল রেখা” নাটকের কাজল সেজে অভিনয় করেছিলেন আমার এক ক্লাসমেটের বড় ভাই যিনি কিনা উনার ঘাড়ের পেছনে পড়ে থাকা বিশাল বিশাল লম্বা চুলগুলোকে মাঝে মাঝে নেড়ে চেড়ে দিয়ে খুব ভাব নিতেন।
কাজলকে দেখে খুবই অবাক হলাম, সবচেয়ে অবাক হলাম রেখাকে দেখে। তার মুখেও ছিল যথারীতি সাদা রঙ, কিছুক্ষণ দেখেই বিরক্ত লাগল। সেই বয়স্ক লোকটিকে দেখলাম বেশ গম্ভীরভাবে আস্তে আস্তে কি বলে দিচ্ছেন আর তার কথাগুলোই মঞ্চের অভিনেতারা আওড়ে যাচ্ছে। উনাকে তখন ঐ অবস্থায় দেখে বেশ একজন গুরুগম্ভীর লোক বলেই মনে হলো।
আমি কিছুক্ষণ নাটক দেখেই ঘুমিয়ে পড়লাম। জেগে ওঠলাম মানিকের গুতো খেয়ে, বললো:
“এই রাসেল, ওঠ, ওঠ, ওঠ দ্যাখ, দ্যাখ রেখা আইছে”
বলাই বাহুল্য পালার নায়িকা রেখা মঞ্চে এসেছে যাত্রার ঢঙ্গে, এসেই সংলাপ বলা শুরু করে দিয়েছে। আমি আবারো ঘুমিয়ে গেলাম।
পরদিন আমি বাসায় এসে বিস্তর হাসাহাসির খোরাক হলাম। জানতে পালাম রেখা চরিত্রে কোন মেয়ে অভিনয় করেনি, গ্রামের একটি ছেলে মেয়ে সেজে অভিনয় করেছে, আমি খবরটি শুনে বিস্মিত হলাম, আমি কিনা সামনে বসেও এ রহস্যটি উদঘাটন করতে পারিনি। আগের রাতের যাত্রাপালা অবশ্য সুন্দরভাবে সম্পূর্ন শেষ হতে পারেনি, শেষ দিকে বৃষ্টি এসে রেখা পালার যবনিকা ঘটায়।
ট্রলার
ট্রলার যখন ছাড়লো কিছুক্ষণের মধ্যেই আমদের ট্রলার নদীর মাঝামাঝি এসে পড়লো। আমি ট্রলারের উপরে বসবো বলে সামনে দাড়ালাম, দূর থেকে আমাদের বাসার সামনের বিশাল বিশাল রেইন-ট্রি গাছগুলোকে অনেক ছোট ছোট দেখাতে থাকলো।
এই প্রথম গ্রামের উল্টো দিক থেকে গ্রামের পরিপূর্ণ সৌন্দর্য দেখতে পারলাম, বুঝলাম গ্রামের চারপাশ থেকে হাওর আর নদী যৌথভাবে কিভাবে গ্রামটিকে চেপে ধরেছে। মনে হলো এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।
আচমকা মনে হলো আমি যে প্যান্টটি পড়ে মানিকদের বাড়িতে যাচ্ছি সেটার নীচ দিক দিয়ে অনেকটা জায়গায় আগেরদিন ছিড়ে গিয়েছিল, পড়ার সময় খেয়াল ছিলনা তাই এ মুহূর্তে মনে পড়াতে চরম অস্বস্থিকর অবস্থাতে পড়লাম, এখন আর বাসায় ফেরার ও কোন উপায় নেই।
ট্রলারের উপর উঠেই মানিক আমাকে ডাকতে শুরু করলো “এই রাসেল, এইখানে চইল্যা আয়, দারুন বাতাস লাগতাছে” আমি না শোনার ভান করে অন্যদিকে পাশ ফিরে দাড়ালাম। মাথায় শুধু ঘুরতে থাকলো কোন ভাবেই বসা যাবেনা, কারন বসতে গেলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে।
মানিকদের গ্রামে ইলেকট্রিসিটি তখনো পৌছায়নি, তাই ওদের গ্রামে চতুর্দিকে মনে হল কুপি বাতির রাজ্য, হ্যারিকেনের রাজ্য। শহরে থাকতে আমরা সবাই ঈদের নামাজ পড়ে এসে বড়দেরকে সালাম করতাম কিন্তু এখানে দেখলাম সবাই সন্ধ্যের পর বাড়ি বাড়ি গিয়ে সালাম করছে।
আমি মানিকদের বাড়িতে ঢোকার পর দেখলাম মানিকের আম্মা সহ বেশ কয়েকজন মহিলা অন্ধকারে একসাথে দাড়িয়ে আছে। মানিক বললো আমার আম্মা, আমি আর দেরী না করে মানিকের আম্মাকে সালাম করে ফেললাম, পাশে দেখলাম আরো কয়েকজন বয়োজেষ্ঠ দাড়িয়ে রয়েছেন।
আমি দেরী না করে তাদেরকেও সালাম করলাম একটানে, অত:পর শেষ পা জোড়াকে সালাম করে শেষ করতে পারলামনা ঠিক তার সাথে সাথেই পা জোড়া লাফ দিয়ে একপাশে সরে গেল, উঠে দাড়িয়ে দেখলাম আমার থেকে বয়সে ছোট একটি শাড়ি পড়া মেয়ে লাফ দিয়ে সরে গিয়েছে, আমি বোকার মতোন বুঝতে না পেরে তাকেও সালাম করে ফেলেছি।
অত:পর আমাকে নিয়ে শুরু হলো তারস্বরে হাসাহাসি, মানিকের দুইগাল জুড়ে উপচে পড়া হাসি ছিল দেখার বিষয়, মহিলাদের মধ্যে কথা বার্তা চলছিল ঘটনাটি নিয়ে, একটা কথা অন্ধকারে ঠিকই এসে কানে বেজেছিল “এই পোলাডা এত্তো বেকুব ক্যান?”
হাইস্কুলের গন্ডি পেরিয়ে ঢাকা চলে আসি। পার হয়ে যায় বেশ কিছু বছর অবশ্য আমাদের পরিবার তখনো সেই গ্রাম ছাড়েনি, ছয় সাত বছর পর আবারো কোন এক ঈদের ছুটিতে মানিকদের বাড়ি গেলাম।
বিকেলের মানিকদের বাড়ির উঠোনে বসেছিলাম। হঠাৎ মানিক আমাকে পেটে আবারো গুতো দিয়ে বললো “দেখতো রাসেল, ওকে চিনতে পারিস কিনা?”
আমি বেশ কিছু দূরে দাড়িয়ে খাকা একটি মহিলাকে দেখলাম কোলে বাচ্চা নিয়ে দাড়িয়ে আছে, পেছনে আরেকটি। আমি মানিকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম “কি?” আমার বন্ধু মানিক হোসেন আমার দিকে তাকিয়ে আবারো বললো
“কিরে চিনোস নাই, এইটা সেই মাইয়া, যারে তুই সালাম করছিলি”
আমি দ্বিতীয় বার তাকানোর সাহস না করে অন্য কথা দিয়ে মানিককে ভুলিয়ে দিলাম।কানে বাজতে থাকলো ট্রলারের পুরনো শব্দ।
................................................................................................................................
পুনশ্চ: এবারের ঈদে ঢাকা ছাড়া হচ্ছেনা, বুঝতে পারছি আরেকটি নিরানন্দ ঈদের উপলক্ষ হবে এটি। বহুদিন হয়েছে সে জলের রাজ্য ছেড়ে ঢাকা চলে এসেছি কিন্তু ঘুমোলে এখনো শুনতে পাই সেই একই সুরে আসা ট্রলারের ইঞ্জিনের ধ্বণি, সুর দিয়ে চলে যাচ্ছে ‘দ্রিম দ্রিম, দ্রিম দ্রিম, দ্রিম, দ্রিম, দ্রিম’
[প্রিয় বন্ধুদেরকে জানাচ্ছি 'ঈদ মোবারক', ভাল থাকুন সকলে]
**********
২রা ভাদ্র ১৪১৯
মতিঝিল, ঢাকা।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)










